মঙ্গলবার ২১ জুলাই ২০২৬ - ১৫:৫৬
তৌরাত এবং মৃতের জন্য ক্রন্দন নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান ও হুকুম

হযরত উমর (রা) কয়েকজন সাহাবাকে মহানবীর (সাঃ) হাদীস বেশি বেশি বর্ণনা করার জন্য তিরস্কার‌ ও ভর্ৎসনা এমনকি প্রহার ও হাবস (কারারুদ্ধ) পর্যন্ত করেছেন!!!

হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, দ্বিতীয় পর্ব

হযরত রাসূলুল্লাহর (সা.) হাদীস বর্ণনায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ: হযরত উমর (রা) কয়েকজন সাহাবাকে মহানবীর  (সাঃ) হাদীস বেশি বেশি বর্ণনা করার জন্য তিরস্কার‌ ও ভর্ৎসনা এমনকি প্রহার ও হাবস (কারারুদ্ধ) পর্যন্ত করেছেন!!! যেমন: তিনি (উমর) রাসূলুল্লাহর (সা.) হাদীস বর্ণনা করার জন্য হযরত আবূ হুরায়রাকে (রা.) প্রহার করেছিলেন।

কারণ, তিনি (উমর) রাসূলুল্লাহর (সা.) হাদীস বর্ণনার‌ পক্ষপাতী ছিলেন না এমনকি হাদীস সহীহ ও মু'তাবার (নির্ভরযোগ্য) হলেও। কারণ, তাঁর মত ছিল যে 'একমাত্র পবিত্র কুরআনই আমাদের জন্য যথেষ্ট' (حسبنا کتاب الله ) ((দ্রঃ ইবনে সা'দ সংকলিত আত-তাবাক্বাতুল কুবরা, খ:৪, পৃ:২৪৪, প্রকাশক: দার সাদির, বৈরুত, লেবানন))

হাদীস-ই ক্বিরত্বাসে (কাগজ-কলমের হাদীস )"একমাত্র পবিত্র কুরআনই আমাদের জন্য যথেষ্ট (حسبنا کتاب الله )"-- এ কথা হযরত উমর (রা) ঐ সময় বলেছিলেন যখন হযরত রাসূলুল্লাহ (সা) ওফাতের তিন দিন আগে উম্মাতকে বিচ্যুতির হাত হতে রক্ষাকারী অন্তিম ওয়াসিয়ত লেখার জন্য কালি, কলম ও কাগজ (লেখার সামগ্রী) আনার আদেশ দিয়েছিলেন। হাদীসটি:

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, 'যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ইন্তিকালের সময় নিকটবর্তী হয় তখন গৃহে অনেক লোক উপস্থিত ছিলেন। তাহাদের মধ্যে হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা)ও ছিলেন। এই সময় নবী (সা) বলিলেন, 'আস, আমি তোমাদিগের জন্য একটি (স্মরণ) লিপি লিখিয়া দিয়া যাই যাহাতে তোমরা ইহার পর কখনও গোমরাহ না হও। 'তখন হযরত ওমর (রা) বলিলেন, 'রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর এখন রোগযন্ত্রণা (الوجع) প্রবল হইয়া পড়িয়াছে।

আর তোমাদিগের কাছে কোরআন মজীদ রহিয়াছে, সুতরাং 'আল্লাহর কিতাবই তোমাদিগের জন্য যথেষ্ট। 'এই নিয়া গৃহে উপস্থিত লোকদিগের মধ্যে মতবিরোধ (ইখতিলাফ اختلاف) দেখা দিল এবং তাহারা বিতর্কে (ঝগড়া বিবাদে) লিপ্ত হইয়া পড়িলেন (اختصموا)।

তাহাদিগের মধ্যে কেহ কেহ বলিলেন, 'কাগজ-কলম লইয়া আসো, যেন  রাসূলুল্লাহ (সা) তোমাদিগের জন্য কিছু লিখিয়া দেন।আবার কেহ কেহ সেই কথাই বলিলেন, যাহা ওমর (রা) বলিয়াছেন। অত:পর যখন হৈচৈ (লাঘত্ব্ لغط) এবং মতবিরোধ (ইখতিলাফ اختلاف) চরমে পৌঁছাইল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বলিলেন, 'তোমরা আমার নিকট হইতে উঠিয়া যাও (قوموا عنّی)।' (অধস্তন বর্ণনা কারী) উবায়দুল্লাহ বলেন, 'হযরত ইবনে আব্বাস (রা) (অত্যন্ত দুঃখ ও ক্ষোভের সহিত) বলিতেন, 'ইহা একটি বিপদ, চরম বিপদ (রাযিয়াহ্ رزیۃ) যাহা লোকদিগের মতবিরোধ (ইখতিলাফ اختلاف ) ও শোরগোলের (লাঘত্ব্ لغط) আকৃতিতে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাহার অসিয়ত (وصیۃ) লিখিয়া দেওয়ার ইচ্ছার মধ্যে অন্তরাল হইয়া দাঁড়াইল।'

আর সুলায়মান ইবনে আবূ মুসলিম আহওয়ালের রেওয়ায়াতে (বর্ণিত) আছে,হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলিলেন,হায় বৃহস্পতিবার!কতই না বেদনাদায়ক বৃহস্পতিবার! এই কথা বলিয়া তিনি এমনভাবে কাঁদিতে লাগিলেন যে তাহার অশ্রুতে নীচের বালু-কংকর পর্যন্ত ভিজিয়া গিয়াছিল। (সুলায়মান বলেন,)' আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, হে ইবনে আব্বাস!

বৃহস্পতিবার দিনের ব্যাপারটি কী?' তিনি বলিলেন, 'এই দিন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর রোগযন্ত্রণা (الوجع) খুব বাড়িয়া গিয়াছিল।তখন তিনি বলিয়াছিলেন,'অস্থিখণ্ড (লিখার উপকরণ) লইয়া আস, আমি তোমাদিগের জন্য এমন লিপি (কিতাব বা পত্র) লিখিয়া দিব,যাহার পর তোমরা কখনও গোমরাহ হইবে না। তখন লোকেরা কলহে (تنازع) লিপ্ত হইল। অথচ নবীর সম্মুখে কলহ করা সমীচীন ছিল না।

এই সময় কেহ কেহ বলিলেন, 'তাহার অবস্থা কেমন? তবে কি তিনি প্রলাপ করিতেছেন (ما شأنه أهجر؟)? তাহাকে জিজ্ঞাসা কর। 'কেহ কেহ তাহাকে বারবার জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। সেই সময় তিনি (সা) বলিলেন, 'আমাকে ছাড়িয়া দাও,আমাকে আমার অবস্থায় থাকিতে দাও।আমি যেই অবস্থায় আছি,তাহা ঐ অবস্থা হইতে অনেক উত্তম যেই দিকে তোমরা আমাকে ডাকিতেছে।

'অত:পর তিনি (সা) তাহাদিগকে তিনটি বিষয়ে নির্দেশ দিলেন। (এক) মুশরিকদিগকে আরব উপদ্বীপ হইতে বহিষ্কার করিবে। (দুই) আমি যেইভাবে প্রতিনিধি দলকে সসম্মানে পুরস্কৃত করিতাম (আমার পরে) সেই ভাবে তাহাদিগকে পুরস্কৃত করিবে। আর ইবনে আব্বাস (রা) তৃতীয়টি হইতে নীরব থাকেন অথবা তিনি বলিয়াছেন; কিন্তু আমি (সুলায়মান) তাহা ভুলিয়া গিয়াছি।সুফিয়ান বলেন,'ইহা সুলায়মানের কথা।--- (মোত্তাফাকুন আলাইহি) কাগজ-কলমের হাদীস থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে (রাসূলুল্লাহর কথা, বাণী ও হাদীস কিছুই নয় বরং) 'আমাদের জন্য আল্লাহর কিতাবই যথেষ্ট!!!'-এ মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন স্বয়ং খলীফা উমর (রা)।

আর বর্তমান যুগে 'আহলুল কুরআন' নামক রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ ও হাদীস বর্জন কারী  ভ্রান্ত পথভ্রষ্ট মতবাদের অনুসারীরা খুব সম্ভবতঃ হযরত উমরের (রা) এ উক্তি তাদের ভ্রান্ত মতবাদের পক্ষে দলীল হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবে!!! আর হযরত উমরের (রা) এ উক্তি পরবর্তীতে বিশেষ করে তাঁরই [খলীফা উমরের (রা)] রাজত্ব কালে হযরত রাসূলুল্লাহর (সা) সুন্নাহ ও হাদীস চর্চা, বর্ণনা ও সংকলন নিষিদ্ধ করার ভিত্তি হয়েছে অথবা এ দৃষ্টিভঙ্গির বশবর্তী হয়েই  তিনি [হযরত উমর (রা)] সাহাবাদেরকে (রা ) কম হাদীস চর্চা ও রেওয়ায়ত (বর্ণনা) করার নির্দেশ দিতেন বা এ ব্যাপারে (অর্থাৎ হাদীস বর্ণনা করার ক্ষেত্রে) তাদেরকে অনুৎসাহিত করতেন।

ইবনে সা'দ আব্দুল্লাহ ইবনে 'আলা থেকে বর্ণনা করেছেন: হাদীস ইমলা (শিষ্য কর্তৃক হাদীস লিপিবদ্ধ করার জন্য শায়খ কর্তৃক তার নিজের সংকলিত হাদীস গ্রন্থ থেকে হাদীস পাঠ) করার জন্য আমি কাসেমকে অনুরোধ করি।

তিনি বললেন: হযরত উমরের যুগে (শাসনামলে) হাদীস বৃদ্ধি পেলে হযরত উমর জনগণকে তাঁর কাছে হাদীস সমূহ এনে উপস্থিত করা ও দেখানোর আহ্বান জানান। আর তাঁর কাছে হাদীস সমূহ আনা হলে তিনি সেগুলো পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন।((দ্রঃ আত-তাবাক্বাতুল কুবরা,খ:৫,পৃ:১৮৮))

ইমাম যাহাবীর তাযকিরাতুল হুফফায গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত উমর (রা.) ইবনে মাসউদ, আবুদ্দারদা ও আবূ মাস'ঊদ আনসারী-এ তিনজন সাহাবাকে হাবস (কারারুদ্ধ ) ও কয়েদ (আটক) করে বলেছিলেন: "আপনারা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বেশি বেশি (অনেক) হাদীস বর্ণনা করেছেন।"

আবূ ইয়া'লা আল-খলীলীর কিতাবুল ইরশাদ পুস্তকে বর্ণিত হয়েছে যে হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) একদল ব্যক্তিকে কারারুদ্ধ ও কয়দ করলেন যাদের মধ্যে আবূ হুরায়রাও (রা.) ছিলেন এবং বললেন: আপনারা রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে হাদীস কম বর্ণনা করুন এবং তাঁর (উমর) মৃত্যু পর্যন্ত তারা অন্তরীণ (আটকাবস্থায়) ছিলেন।

আল-খতীবের তাক্বয়ীদুল ইলম গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে: "হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাসূলুল্লাহর সুন্নাহ সমূহ লিপিবদ্ধ করার ইচ্ছা করলেন। অত:পর তিনি এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহর সাহাবাদের সাথে পরামর্শ করলেন এবং তারা সবাই তাকে সুন্নাহ ও হাদীস লিপিবদ্ধ ও সংকলনের পরামর্শ দিলেন। এক মাস পরে তিনি বললেন: আপনাদের আগে আহলে কিতাবের একদল ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের সাথে কিছু বই-পুস্তক (কুতুব) রচনা করে সেই রচিত বই পুস্তকের ওপর তারা পড়ে থেকেছিল এবং তারা আল্লাহর কিতাব বর্জন ও ত্যাগ করেছিল।

আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই আমি কখনো অন্য কিছুর সাথে কিতাবুল্লাহকে (পবিত্র কুরআন) মিশ্রিত হতে দেব না। হযরত উমর (রা.) শুধু সুন্নাহ লিপিবদ্ধ ও সংকলন না করেই ক্ষান্ত হন নি বরং তিনি যে সব গ্রন্থে সুন্নাহ সংকলন ও লিপিবদ্ধ করা হয়েছিল সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেন।"

চলবে….

ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান

Tags

আপনার কমেন্ট

You are replying to: .
captcha